রাজনৈতিক ইসলাম
আজকের মুসলিম বিশ্বে যেসব রাজনৈতিক আন্দোলন এক সাচ্চা ইসলামি বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে তাদের স্বরূপ কী? ভূমিকাই বা কী? পাশ্চাত্যে এসব আন্দোলনকে সাধারণভাবে ‘ইসলামী মৌলবাদ’ বলা হয়ে থাকে। তবে আরব বিশ্বে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বলে যে শব্দবন্ধ চালু রয়েছে সেটিকেই আমি বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করি। এগুলো নিরংকুশ ধর্মীয় আন্দোলন নয়। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে দিব্যি মিল রয়েছে। রয়েছে আরো মামুলি একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য: এগুলো রাজনৈতিক সংগঠন এবং এদের লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। তার কম নয়, বেশিও নয়। এ ধরনের সংগঠনকে ইসলামের পতাকা দিয়ে মুড়ে দেওয়াটা নির্জলা সুবিধাবাদ। আধুনিক রাজনৈতিক ইসলাম উদ্ভাবন করেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সেবক প্রাচ্যবাদীরা। পাকিস্তানের মওলানা আবুল আলা মওদুদীর জন্ম ভারতের হায়দরাবাদে এবং ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে আসেন। একে হুবহু গ্রহণ করেন।
ভারত বিভাগের আভাস পেয়ে এই ধারা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, ইসলামে রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা নয় বলে বিশ্বাসী মুসলমানেরা কেবলমাত্র ইসলামী শাসনব্যবস্থার অধীনেই বাস করতে পারে। নিজেদের সুবিধামতো প্রাচ্যবাদীরা ভুলে গিয়েছিলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইংরেজরাও খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে অবিকল একই ধারণা পোষণ করতো।
মুক্তির নির্মম প্রতিপক্ষ
রাজনৈতিক ইসলাম যে ধর্মকে আবাহন করে তার সম্পর্কে আসলে তা আগ্রহী নয়। কোনো ধরনের সামাজিক ও ধর্মতাত্ত্বিক সমালোচনার প্রস্তাব তাতে নেই। যে রকমটি ল্যাটিন আমেরিকায় দেখা যায় সে রকম কোনো লিবারেশন থিওলজিও এ নয়। রাজনৈতিক ইসলাম বরং লিবারেশন থিওলজির বিপরীত, এটি মুক্তির কথা বলে না, বলে বশ্যতার কথা। সুদানের মাহমুদ তাহাই একমাত্র মুসলিম বুদ্ধিজীবী যিনি তাঁর ব্যাখ্যায় ইসলামের মুক্তির উপাদানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু এ রকম ধ্যানধারণার জন্য খার্তুমের শাসকরা যখন তাঁর প্রাণদণ্ডের আদেশ দেয় তখন ‘উগ্রপন্থী’ বা ‘নরমপন্থী’ কোনো ইসলামি গোষ্ঠীই প্রতিবাদ করে নি। যে সব বুদ্ধিজীবী ইসলামি রেনেসাঁর সঙ্গে একাত্ম বলে দাবি করেন এবং যাঁরা এসব আন্দোলনের সঙ্গে ‘সংলাপ’ চালিয়ে যেতে আগ্রহী তাঁরাও তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেন নি। এমনকি তাঁর প্রাণদণ্ডের খবর পাশ্চাত্য গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয় নি।
ইসলাম ধর্ম থেকে রাজনৈতিক ইসলাম যা নিয়েছে তা হলো এ কালের কিছু সর্বজনীন মুসলিম অভ্যাস, বিশেষ করে সেইসব আচার-অনুষ্ঠান যেগুলোর প্রতি কঠোর নিষ্ঠা দাবি করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে তা দুই শতাব্দী আগের শাসকরা অটোমান সাম্রাজ্যে, ইরানে এবং মধ্য এশিয়ায় যেসব ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন আইন-কানুন চালু করেছিলেন সেগুলোর দিকে সাংস্কৃতিকভাবে পুরোপুরি ফিরে যাওয়ার দাবি জানায়। রাজনৈতিক ইসলাম বিশ্বাস করে অথবা এ রকম বিশ্বাসের ভান করে যে এইসব আইন-কানুনই হচ্ছে ‘সাচ্চা ইসলাম’, নবীর যুগের ইসলাম। তবে এটি তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ক্ষমতার চর্চাকে জায়েজ করার জন্য এ ধরনের ব্যাখ্যা ইসলামে অবশ্যই গ্রাহ্য হয়েছে। ইসলামের উদ্ভবের সময় থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত এই ঘটে আসছে।
এদিক থেকে ইসলামের কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই। প্রাক-আধুনিক ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার জন্য খ্রিস্ট ধর্মও এ রকমটিই করেছিল। যাঁর ন্যূনতম সচেতনতা ও বিচারবুদ্ধি রয়েছে তিনিই স্বীকার করবেন, যেসব ডিসকোর্স কোনো কিছুকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় তাদের প্রতিটির পেছনেই থাকে বাস্তব ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থা। কিন্তু এসব কিছুতে রাজনৈতিক ইসলামের আগ্রহ নেই, বিষয়ব্যবস্থার কোনো বিশ্লেষণ বা সমালোচনাও তাতে নেই। আজকের ইসলাম একটি অতীতকেন্দ্রিক মতাদর্শ যা সোজাসুজি অতীতে, কিংবা আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, মুসলিম বিশ্ব পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অধীনে আসার ঠিক আগের সময়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ধর্মের—তা ইসলাম, খ্রিস্ট ধর্ম বা যা কিছুই হোক না কেন—এ রকম গোঁড়া প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাখ্যা কোনো বিকল্প ভাষ্যকে, সংস্কারপন্থী বা বিপ্লবী ব্যাখ্যাকে নাকচ করতে পারে না। অতীতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments